মত-অমত

মত-অমত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলা সাহিত্যের রাজাধিরাজ

“আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি বসি পড়িছ আমার কবিতাখানি
কৌতুহল ভরে—”

রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা সাহিত্য অচিন্তনীয়, অকল্পনীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনীতে বিশ্বসাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের যেটুকু অর্জন, তা অন্যকারো হাত দিয়ে সম্ভব হয়নি। আর তাই, বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে বাংলা ভাষাার মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্তরে তুলে ধরার একক কৃতিত্বটুকু তাঁরই, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাঁর রচিত কবিতা, গান, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ — বাংলা সাহিত্যে তাঁর রাজ্য এবং রাজত্ব, দুটোই আজো অক্ষুন্ন। আজও জ্ঞান পিয়াসী চাতকেরা তাঁর কাব্যরসের অমিয় সুধা পান করে চলেছেন। মদিরার নেশার মত তাঁর গানের সুরে

মাতাল হয়ে জীবনের সুখ খুঁজে নিচ্ছেন। এমনই এক চিরঞ্জীব সাহিত্যের স্রষ্টা তিনি।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য যেন একই সাথে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে আধ্যাত্মিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ দর্শনের চমৎকার মেলবন্ধন। একই সাথে মানব মর্যাদাকে সর্বাগ্রে ধারণ করে বলিষ্ঠ কন্ঠে স্রষ্টার প্রতি প্রার্থনায় তিনি বলে ওঠেন—

“চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর।”

আবার কত সুন্দর ভাবে তিনি একটা শিশুমনের কল্পনাকে কবিতায় তুলে ধরতে পারেন, তার প্রমাণ পাই বীরপুরুষ কবিতায় এভাবে—

“মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে,
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

কত সহজ-সরল অথচ কী গভীর মমতা দিয়ে তিনি ধারণ করেছেন কবিতার প্রতিটি কথা, প্রতিটি চরণ! এভাবে তিনি তাঁর রচনায় স্রষ্টাার প্রতি সৃষ্টির প্রেম, মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম, মায়ের প্রতি সন্তানের প্রেম এবং দেশপ্রেম—সবগুলোকে কাব্যের সুতোয় গেঁথে আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন বিশ্বসাহিত্যের কাতারে।

রবীন্দ্রনাথের গান সম্পুর্ণ বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তাঁর গানে প্রেম, প্রকৃতি, আত্মান্বেষণ, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। এসব গান আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে আমাদেরকে নতুন আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর গানে আমরা যেভাবে একই সাথে প্রকৃতিপ্রেম, মানব প্রেম বা দেশপ্রেমকে পাই, তা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সাহিত্যে বিরল। আমাদের জাতীয় সংগীতসহ অনেক দেশাত্ববোধক গানে যে মমত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা অতুলনীয়।

“ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা॥”

কী উপলব্ধি! কী মায়া আর মমতা দিয়ে জড়িয়ে ধরা প্রতিটি কথা যেভাবে আমাদের দেহ মনে এক অবর্ণনীয় শিহরণ জাগায় তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

একজন ছোট গল্পকার হিসেবেও তাঁর প্রতিটি গল্পই বিশ্বমানের। হৈমন্তী, অপরিচিতা,কাবুলিওয়ালা বা তোতা কাহিনী—প্রত্যেকটি গল্পের পটভুমি,চরিত্র,কাহিনী বিন্যাস এবং আকস্মিক সমাপ্তি যেন বলে দিচ্ছে , ‘শেষ হইয়া্ও হইলনা শেষ!’ তাঁর গল্প লেখনীর শক্তিশালী বুনটে আমরা তাঁর মাঝে পাই পাশ্চাত্য সাহিত্যিক জন মিল্টন, ও হেনরী, মার্জারি কিনান রলিং কিংবা উইলিয়াম সেক্সপিয়ারকে।

আবার আমরা যদি তাঁর রচিত নাটক গুলোর দিকে তাকাই তাহলে সেখানেও তাঁর মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। তাঁর নাটক প্রধানত ভাবাত্মক, গীতিধর্মী এবং তত্ত্বচিন্তাবাহী। তাঁর নাটকে সমকাল সমাজ ও ব্যক্তিসমস্যার নানান জটিল অবস্থা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি সমকালীন সমাজ ও ব্যক্তির চরিত্রকে নাট্যরুপে চিত্রিত করেছেন কয়েক ভাবে। ‘গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য ও নাট্যকাব্য – এ তিন ধারায় রচিত নাটকগুলো বাংলা সাহিত্যের এক একটি অমূল্য সম্পদ।

বাংলা সাহিত্যের সমকালীন লেখকদের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা উপন্যাসের ভাষা ও কাহিনী বিন্যাস সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল হওয়ায় খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। ১৮৮৩ সাল থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যকার এই সময়কালে তিনি মোট ১৩টি উপন্যাস রচনা করেছিলেন যার মধ্যে ’করুণা’ নামে তাঁর একটি অসমাপ্ত উপন্যাসও রয়েছে। ‘নৌকাডুবি’,’গোরা’,’ চতুরঙ্গ’ সহ প্রতিটি উপন্যাসই এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর লেখা ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি যেন মানব জীবন দর্শনের একটা সেরা উপাখ্যান। উপন্যাস গুলির পটভুমি, কাহিনী ও চরিত্র বিন্যাস সমসাময়িক হলেও বিশ্বসাহিত্যের মানদন্ডে সর্বজনীন। আর এভাবেই তিনি আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় নিপুণ স্রষ্টার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েই পদচারণা করেছেন সগৌরবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের রাজাধিরাজ। তিনি একাধারে একজন ভাষাবিদ, একজন অমর সংস্কৃতিবিদ, একজন দার্শনিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ এবং একই সাথে একজন মানবিক সমাজকে আলোকিত করার পথ প্রদর্শক। তাঁর কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্প, গদ্য রচনাবলী সবই বিশেষ ঔজ্জ্বলতা ও আধ্যাত্মিক সত্ত্বায় দ্যূতিময়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যে এক একটি অমূল্য সম্পদ। প্রতিটি রচনা যেমন একদিকে মানুষের হৃদয়ে আলোকিত সত্যের সন্ধান দেয়, তেমনি প্রেম, স্বাধীনতা, প্রকৃতির সাথে একাত্মতা, মানুষের আন্তরিকতা ও মানব জীবনের প্রতিটি দিককে উদ্ভাসিত করে তোলে।

একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত দিয়ে বিশ্ব সাহিত্যেরভাণ্ডারে বাংলাভাষার যে সম্পদ গচ্ছ্বিত রাখা হয়েছে, তাতে যতদিন পৃথিবীতে বাঙালি ও বাংলা ভাষার অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন বিশ্ব সাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

 

বিষয়:
পরবর্তী খবর

নজরুল জয়ন্তী আয়োজন ২০২৪

নজরুল ইসলাম : বাঙালির কবি

[নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণার যৌক্তিকতা কিংবা অদ্যাবধি এ বিষয়ে কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে কি হয়নি, সমালোচক বিশেষের তোলা এসব বিতর্কে না গিয়ে, এমনকি “বাংলাদেশী” জাতীয়তার অর্থে নয় — বৃহত্তর বাঙালিত্বের ধারণা থেকেই, তিনি কেন আমাদের ‘জাতীয় কবি’, সেটাই লেখক সংক্ষেপে এ প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাবো।]

সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার তৎকালীন এ্যালবার্ট হলে নজরুল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন : “আমরা যখন যুদ্ধে যাবো — তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো।” নজরুল প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্রের এই উক্তিটি বহু-উদ্ধৃত। সুভাষচন্দ্র তাঁর ওই ভাষণে নজরুল সম্পর্কে একাধিকবার ‘জ্যান্ত মানুষ’ কথাটা ব্যবহার করেছিলেন। এ কথার দ্বারা তিনি নজরুল প্রতিভার ‘প্রাণময়তা’র কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের প্রাণ নেই তাই আমরা এমন প্রাণময় কবিতা লিখতে পারি না।” তাঁর মতে সাহিত্যে জীবনকে, যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে নজরুলের মতো করে অন্তত তখন পর্যন্ত এদেশে আর কেউই প্রতিফলিত করতে পারেননি। এই না-পারার কারণ, সুভাষচন্দ্র বলেছেন, দেশের পরাধীনতা। তার মানে কথাটা দাঁড়াচ্ছে, পরাধীন দেশেও নজরুল ছিলেন একজন মুক্তপ্রাণ মানুষ। সাহিত্যে জীবনের এই প্রতিফলন, প্রাণের এই স্পর্শের কারণেই নজরুলের লেখার প্রভাব হয়েছে ‘অসাধারণ’। আর তা এতই অসাধারণ যে, সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “তাঁর গান পড়ে আমার মতো বেরসিক লোকেরও জেলে বসে গাইবার ইচ্ছা হতো।” নজরুলের ‘দুর্গম গিরি’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে অভিহিত করে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই। প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সংগীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো প্রাণ-মাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না।” তবে উক্ত ভাষণ সুভাষচন্দ্র শেষ করেছিলেন খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, নজরুলের স্বপ্নটা ‘সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন’। (মান্নান : ৫৪) এ কথার দ্বারা সুভাষচন্দ্র অনেকদিন আগেই বাঙালির জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলের প্রতি স্বীকৃতি ঘোষণা করে গেছেন। বলা বাহুল্য হিন্দু-মুসলমান উভয় সংস্কৃতির উপাদানে গঠিত যে বাঙালিত্ব, সে অর্থেই নজরুলকে ‘সমগ্র বাঙালি জাতি’র স্বপ্নদ্রষ্টা বলেছিলেন তিনি।

অন্যদিকে বাঙলার আরেক বিশিষ্ট নেতা বিপিনচন্দ্র পাল, যিনি ছিলেন প্রচণ্ড রকমে রবীন্দ্রবিরোধী, চিত্তরঞ্জন দাশের নারায়ণ পত্রিকায় রবীন্দ্রবিরোধী প্রচারণার ক্ষেত্রে যাঁর ছিল বলতে গেলে কাণ্ডারির ভূমিকা, রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্যাপারে যাঁর একটা বড় অভিযোগ ছিল যে দেশের মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই, নজরুলের কবিতায় তিনি মাটির গন্ধ খুঁজে পেয়েছিলেন; বলেছিলেন, “এ খাঁটি মাটি হইতে উঠিয়াছে”। আর এ-প্রসঙ্গে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, কিছুটা অশোভনভাবেই তাঁর ঠাকুরদাকে অবধি টেনে এনে বঙ্গবাণী পত্রিকায় (১৮ জুন ১৯২৩) বিপিন পাল লিখেছিলেন, “আগেকার কবি যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা দোতলা প্রাসাদে থাকিয়া কবিতা লিখিতেন। রবীন্দ্রনাথ দোতলা হইতে নামেন নাই। কর্দমময় পিচ্ছিল পথের উপর পা পড়িলে কেবল তিনি নন, দ্বারকানাথ ঠাকুর পর্যন্ত শিহরিয়া উঠিতেন।” নজরুলকে বিপিন পাল ‘নতুন যুগের কবি’ এবং তাঁর কবিতায় ‘দেশে যে নতুন ভাব জন্মেছে তার সুর’ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। (মান্নান : ৫৫)

আর প্রফুল্লচন্দ্র রায় পূর্বোক্ত এ্যালবার্ট হলের সংবর্ধনা সভায়ই তাঁর সভাপতির ভাষণে নজরুলকে ‘প্রতিভাবান মৌলিক কবি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, “তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি।” এবং “কারাগারে শৃংখল পরিয়া বুকের রক্ত দিয়া তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা বাঙালির প্রাণে এক নতুন স্পন্দন জাগাইয়া তুলিয়াছে।” প্রফুল­চন্দ্র রায় এ প্রসঙ্গে আরও বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথের আওতায় নজরুলের প্রতিভা পরিপুষ্ট হয় নাই। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁহাকে কবি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন।” (মান্নান : ৫৩) বস্তুত রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে কেবল কবি বলে স্বীকারই করেননি, (পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় যদি ভুলভাবে উদ্ধৃত করে না থাকেন), তাঁর রচনাকে এমন কি ‘মহাকাব্য’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। নজরুল-প্রতিভা সম্পর্কে আপন ভক্ত-অনুরাগী মহলের ‘কিছু সন্দেহ’র জবাব দিতে গিয়ে তিনি যা বলেছিলেন তা এ-প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য :

“… নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারোনি। আমার বিশ্বাস, তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও রূপ ও রসের সন্ধান করোনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।”

নজরুলের কবিতায় সমসাময়িকতার প্রভাব ও/বা তার চড়া সুর (নিশ্চয় নজরুলের সব কবিতা সম্পর্কে কথাটা প্রযোজ্য নয়) যাঁদেরকে তাঁর রচনার কাব্যমূল্য বা স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান রেখেছিল তাঁদের সে সন্দেহ বা অভিযোগ নাকচ করে রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন :

“কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এসব তোমাদের অবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজত।” (মান্নান : ৫১)

২.

জীবনানন্দ দাশ, অনেকেরই বিচারে রবীন্দ্রপরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা যিনি, নিজে অভিহিত হয়েছেন কখনো ‘নির্জনতম’ আবার কখনো ‘শুদ্ধতম’ কবি হিসেবে, নজরুলের কবিতা সম্পর্কে যাঁর মূল্যায়ন ‘চমৎকার কিন্তু মানোত্তীর্ণ নয়’, তিনিও নজরুলের কাব্য-সাধনার ‘অসার্থকতা’র জন্য যতটা না তাঁর প্রতিভার বৈশিষ্ট্যকে তার চেয়ে বেশি যুগ-পরিবেশকে, জনরুচির ‘অনুত্তীর্ণত’াকে দায়ী করেছেন। তাঁর ‘নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করা যাক :

“জনগণ তখন আজকের মত ঈষৎ উন্নত কিংবা রূপান্তরিত? [য.প্রা.] — ছিল না; চমৎকার কবিতা চাচ্ছিল, (আজো জনমানস রকমফেরে তাই-ই চায় যদিও); নজরুল সেই মন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এমনভাবে যে আজকের কারও কোনো জনসাধারণের জন্যে তৈরী কবিতা বা গদ্যকবিতা ফলত পদ্যের স্তরে নেমেও তা পেরেছে কিনা বলা কঠিন। তখনকার দিনে বাংলায় লোকোত্তর পুরুষ কম ছিলেন না — শ্মশানের পথে সন্তানোৎসব জমেছিল বেশ খানিকটা ঔদাত্ত্যে। নজরুল ইসলামের আগ্রহ পুষ্ট হয়েছিল, তিনি অনেক সফল কবিতা উৎসারিত করতে পেরেছিলেন। কোনো-কোনো কবিতায় এতো বেশি সফলতা যে কঠিন সমালোচকও বলতে পারেন যে নজরুলী সাধনা এইখানে-এইখানে সার্থক হয়েছে; — কিন্তু তবুও মহৎ মান এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময়ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সফল ও কোনো-কোনো কবিতা সার্থক হয়েছিল — জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতায় মূল্য-ও-মাত্রা-চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় — আমাদের হৃদয়ও আমাদের বিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয়; এই সাময়িকতার নিয়মই হয়তো তাই। কিন্তু ব্যক্তিকতা নজরুলের ও সময় এই বুদ্ধিসর্বস্বতার হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল।” (ফয়জুল : ১০৩)

উদ্ধৃতিটা বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। কারণ এর অভাবে জীবনানন্দের বক্তব্যের মর্মার্থ উপলব্ধিতে আমাদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। আমরা জানি কাব্য বিচারে জীবনানন্দের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় শুদ্ধতাবাদীর। কবিতায় মানুষ বা সমাজের প্রতি দায়বোধ কিংবা তাঁর নিজের ভাষায় ‘চিন্তা ও সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন ও মতবাদ’ তাঁর মতে ততটা পর্যন্ত অনুমোদনযোগ্য যতক্ষণ তা ‘সুন্দরীর কটাক্ষের পিছনে শিরা, উপশিরা ও রক্তের কণিকার মতো লুকিয়ে থাকে’। (’কবিতার কথা’) নজরুলকে তিনি যে কোথাও কোথাও সফল এমন কি সার্থক ভেবেও চূড়ান্ত বিচারে অসার্থক বিবেচনা করেছেন সে তাঁর কাব্য বিচারের ওই মানদণ্ড থেকেই। এবং হয়তো নজরুলের কাব্যসাধনার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় লাভের সুযোগ ছাড়াই।১ নজরুলকে তিনি শেষাবধি বাংলা কাব্যের আবহমান ধারায় লালিত, বিশেষ করে রবীন্দ্র ঐতিহ্যের ‘আবহপুষ্ট’ ও ‘সেই পরিমণ্ডলেরই অন্তর্লীন একজন কবি’ হিসেবে দেখেছেন, যিনি ‘যেখানে-যেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে অতিক্রম করেছেন’ সেখানেও ‘এমন কোনো নতুন সূচনালোকে পৌছুতে পারেন নি, যার থেকে সত্যিই একটা স্বতন্ত্র ঐতিহ্য (কবিতার) সৃষ্টি হতে পারে’। ‘আধুনিকতা’, ‘বৈদগ্ধ্য’, কাব্যবোধ বা রুচি ইত্যাদি সম্পর্কে যুদ্ধোত্তর পশ্চিমী ধারণাকে প্রায় স্বতঃসিদ্ধজ্ঞানে গ্রহণ করার ফলেই এলিয়ট ও ইয়েটসের সঙ্গে নজরুলের ‘আশ্চর্য আবশ্যিক পার্থক্য’ জীবনানন্দকে নজরুলের কবিতা সম্পর্কে কতিপয় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে। তারপরও এ-প্রসঙ্গে জীবনানন্দের মন্তব্য : “কাজী নজরুল যদি ইউরোপীয় সাহিত্যের রীতি ও পরিণতির নিকট কোনো দিক দিয়ে ঋণী থাকেন, তা’হলে তা অনেকটা মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায়। এ রকম পটভূমি বেছে নিতে হলে আধুনিকতর কবিদের শ্বাস আটকে আসত; কিন্তু নজরুল ইসলামের পক্ষে রবীন্দ্র-পরিস্রুত বিদেশী কাব্যেরও ততটা দরকার ছিল না — আধুনিক বাংলাদেশে তিনি বাংলার মাটিরই বিশেষ স্বায়ত্ত সন্তান বলে। আজকের বাংলার অন্য কোনো কবি সম্পর্কে এ-কথা বলা চলে না হয়তো। তাঁরা অনেকেই তাঁদের বিমুক্ত পরিব্রাজক সত্তাকে সংহত করেই বাঙালি।” (‘কবিতা পাঠ : দুজন কবি’) নজরুলের কবিতার স্থায়িত্ব বা মহত্ব নিয়ে তাঁর ঘোরতর সংশয়ী অবস্থান সত্ত্বেও জীবনানন্দ তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন এই স্বীকৃতি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে :

“বাংলার এ মাটির থেকে জেগে, এ মৃত্তিকাকে সত্যিই ভালোবেসে আমাদের দেশে উনিশ শতকের ইতিহাসপ্রান্তিক শেষ নিঃসংশয়তাবাদী কবি নজরুল ইসলাম। তাঁর জনপ্রেম, দেশপ্রেম, পূর্বোক্ত শতাব্দীর বৃহৎ ধারার সঙ্গে সত্যিই একাত্ম। পরবর্তী কবিরা এ সৌভাগ্য থেকে অনেকটা বঞ্চিত বলে আজ পর্যন্ত নজরুলকেই সত্যিকারের দেশ ও দেশীয়দের বন্ধু কবি বলে জনসাধারণ চিনে নেবে। জন ও জনতার বন্ধু ও দেশপ্রেমিক কবি নজরুল।” (ফয়জুল : ১০৯)

বুদ্ধদেব বসু, বাংলা আধুনিক কাব্য সমালোচক হিসেবে তাঁর স্থান নিঃসন্দেহে শীর্ষে, তো প্রায় কিশোর বয়সে প্রথমে মাসিকপত্রে ছাপার অক্ষরে ‘বিদ্রোহী’ এবং তারপর ‘নোয়াখালির রাক্ষসী নদীর আগাছা-কণ্টকিত কর্দমাক্ত’ পাড়ে বসে কলকাতা-আগত এক মুসলমান যুবকের খাতায় কপি করা নজরুলের ‘আরো অনেকগুলি’ কবিতা পড়ে তাঁর সেই যে বিস্ময়-বিমুগ্ধতা তা তিনি পরে কাটিয়ে উঠেছিলেন সত্যি। কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে নজরুল বিচার করতে গিয়ে তিনি এ-পর্যায়ে যা লিখেছেন তা-ও যেন ভারসাম্যহীন ও আগাগোড়া স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। নজরুলের প্রভাব তাঁর সময়ে ‘বোধহয় রবীন্দ্রনাথের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল’২ এবং ‘নজরুল সম্বন্ধে বিশেষভাবে বলবার কথা এইটেই যে তিনি একই সঙ্গে লোকপ্রিয় কবি ও ভালো কবি’ ইত্যাকার বাক্যের পাশেই কিংবা তার কিছু পরেই আবার তাঁর মন্তব্য : ‘একটি দুটি স্নিগ্ধ কোমল কবিতা ছাড়া [নজরুলের] প্রায় সবই ভাবালুতায় আবিল, অনর্গল অবচেতন বাক্যবিন্যাসে প্রায় অর্থহীন’। কখনো কিপলিংয়ের সঙ্গে (‘কোলাহলকে গানে বাঁধা’, লেখায় ‘শুধুই হৈ-চৈ আছে, কবিত্ব নেই’) আবার কখনো বায়রনের সঙ্গে (‘… সেই উচ্ছৃঙ্খলতা, আতিশয্য, শৈথিল্য, সেই রসের ক্ষীণতা, রূপের হীনতা, রুচির স্খলন’) নজরুলের প্রতিভা বা কবিস্বভাবের সাদৃশ্য টেনে বুদ্ধদেব বসু যা বলতে চেয়েছেন তা হল, নজরুলের কাব্যসাধনায় ‘কোনো পরিণতির ইতিহাস পাওয়া যায় না’, বছরের পর বছর তিনি ‘একই রকম’ লিখে গেছেন, কখনো নিজেকে অতিক্রমের চেষ্টা করেননি। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি ধার করে বুদ্ধদেব আরও বলেছেন, নজরুলের প্রতিভা ‘ধনী, কিন্তু গৃহিণী নয়’। (বুদ্ধদেব : ৯০-৯১)

নজরুলের সমস্ত সৃষ্টির সারিতে তাঁর গানগুলিকেই বরং সবচেয়ে সার্থক ও স্থায়িত্বের দিক থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে বুদ্ধদেব বসুর মনে হয়েছে। আর এই গানের মধ্যে নজরুলের বীরত্বব্যঞ্জক বা স্বদেশপ্রেমমূলক গানগুলোকে তাঁর মনে হয়েছে সেরা (এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের পরে ও ‘সম্ভবত দ্বিজেন্দ্রলালের উপরে’ নজরুলের স্থান নির্দেশ করেছেন বুদ্ধদেব বসু), ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’কে বলেছেন ‘উৎকর্ষের শিখরস্পর্শী’। বুলবুল ও চোখের চাতক-এর কিছু গান সম্পকের্ও তাঁর মšতব্য : ‘অনিন্দ্য বললে অত্যন্ত বেশি বলা হয় না’। কিন্তু এই বক্তব্যের অব্যবহিত পরেই আবার নজরুলের বাকি গানগুলো সম্পর্কে ‘দুরতিক্রম্য রুচির দোষে’র অভিযোগ তুলে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “শুধু যদি এই দোষ না থাকতো, শুধু যদি তাঁর রুচি হ’তো পরিশীলিত, তাহলে তাঁর মধ্যে একজন মহৎ গীতিকারকে আমরা বরণ করতে পারতাম।” (বুদ্ধদেব : ৯১) তারপরও এই ‘অসার্থক’ কবি কিংবা মহৎ-গীতিকার হবার সম্ভাবনা নিয়েও হতে-না-পারা (!) নজরুল সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর রায় :

ক. … পঁচিশ বছর ধ’রে তিনি আমাদের যা দিয়েছেন, সেই তাঁর অজস্র কাব্য ও সংগীত বাঙালির মনে তাঁকে স্মরণীয় ক’রে রাখবে। (বুদ্ধদেব : ৮৯)

খ. ‘বিদ্রোহী’ কবি, ‘সাম্যবাদী’ কবি কিংবা ‘সর্বহারা’র কবি হিশেবে মহাকাল তাঁকে মনে রাখবে কিনা জানি না, কিন্তু কালের কণ্ঠে গানের যে মালা তিনি পরিয়েছেন, সে মালা ছোটো কিন্তু অক্ষয়। … শুধু বাংলা কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে তাঁর আসন নিঃসংশয়, কেননা তাঁর কবিতায় আছে সেই বেগ, যাকে দেখামাত্র কবিত্বশক্তি ব’লে চেনা যায়। (বুদ্ধদেব : ৯২)

৩.

আপন রচনার শিল্পসার্থকতা বা তার স্থায়িত্ব নিয়ে নজরুল কিন্ত মোটেও ভাবিত ছিলেন না। যুগের নকিব তিনি, ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় কৈফিয়তের সুরে যথার্থই বলেছেন :

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি !
কেহ বলে, তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে !
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী !

বলেছেন, ‘অমর কাব্য তোমরা লিখিও …’, এবং

পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

৪.

‘পৃথিবীর কবি’ হিসেবে তাঁর ‘স্বরসাধনায় বহুতর ডাক না পৌঁছানো’র — ‘ফাঁক রয়ে যাবা’র কথা রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করে নিয়েছেন। ‘ঐকতান’ কবিতায় আপন ‘সুরের অপূর্ণতার নিন্দা’ মেনে নিয়ে বলেছেন, ‘আমার কবিতা, জানি আমি,/গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী’। সাহিত্যের আনন্দের ভোজে নিজে যা দিতে পারেননি এমন কি তার ‘খোঁজে থাকা’র কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রযুগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের সে অপূর্ণতা পূরণে নজরুলের ভূমিকাই যে প্রথম ও প্রধানতমের, এ সত্য অস্বীকার করবে, কার সাধ্যি?

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শেষ বাক্যগুলোর অনুসরণে আমরাও যেন বিশ্বাস করেছি, যবেতক ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে’ ধ্বনিত হবে, ‘অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ’ উদ্যত থাকবে, নজরুলের কবিতার আয়ু বা আবেদন আসলে ততদিনই। আশা আমরা নিশ্চয় করব, স্বপ্ন দেখব এক সুন্দর সুদিনের যেদিন নজরুলের কবিতা সত্যিসত্যিই তার লড়াকু আবেদন খুইয়ে বসবে। কিন্তু সেদিন কবে আসবে? আদৌ কখনো আসবে কি? এদেশে বা পৃথিবীর কোথাও এমন সমাজ কি কখনো কায়েম হবে যেখানে কোনো রকম শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য-বিভেদ, অন্যায়-উৎপীড়ন থাকবে না; কায়েমি স্বার্থ নামক বিষয়টির চির অবসান ঘটবে? সে সম্ভাবনা কি অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে আজ আরও দূরপরাহত বলে মনে হচ্ছে না? এ কারণেও নজরুল আরও বহুদিন আমাদের যুদ্ধসঙ্গী, তাঁর কবিতা-গান আমাদের অপরিহার্য রণবাদ্য-রণসঙ্গীত।

৫.

রবীন্দ্রনাথের সব কবিতা যে তাঁর সময়েও সব পাঠকের ভালো লাগতো তা তো নয়। আর আজকের দিনে তাঁর অনেক কবিতাই হয়তো প্রকৃত কাব্যামোদীদেরও আগ্রহ কাড়তে ব্যর্থ হবে। ব্যক্তির কাব্যবোধ বা অনুভূতির কথা বাদ দিলে এক্ষেত্রে পরিবর্তিত যুগরুচিরও একটা ভূমিকা আছে। কবিতা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য সাহিত্যসৃষ্টির বেলায়ও একথা প্রযোজ্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে বাংলা কবিতায় যুগান্তর ঘটিয়েছেন, তাঁর নানা সৃষ্টিসম্ভার দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অন্তত একশো বছর এগিয়ে দিয়ে গেছেন, বাঙালির চিন্তা ও মননে সুগভীর ও স্থায়ী একটা প্রভাব সৃষ্টি করেছেন, এটা তো ঐতিহাসিক সত্য। এ কারো স্বীকার বা অস্বীকারের অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ, আমরা বলতে চাইছি, লেখক বা সাহিত্যিকের ভূমিকা কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টির দিক থেকে নয়। কিংবা হয়তো তার মাধ্যমেও তাঁরা আসলে জাতির মননচর্চা তথা সামাজিক বিকাশে একটা ভূমিকা রাখেন। সে ভূমিকাটা ঐতিহাসিক। পৃথিবীর সব বড় কবি-লেখক-শিল্পী সম্পর্কেই কথাটা কমবেশি খাটে। নজরুলের আবির্ভাবের আগে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের ভূমিকা ছিল প্রায় অধমর্ণের। বাঙলার জনসংখ্যার অর্ধেক বা তার বেশি হয়েও তাঁরা জানতো বাংলা সাহিত্যের কাছে তাদের নেয়ার মতো যদি বা কিছু থাকে, দেয়ার বিশেষ কিছু নেই। এ ব্যাপারে নিজেদের যোগ্যতা সম্পর্কেও তারা ছিল সন্দিহান। বাঙালি মুসলমানের এই হীনম্মন্যতা দূর করে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চারের ক্ষেত্রে যে-দুজনের ভূমিকা মুখ্য তাঁদের একজন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও অন্যজন কবি নজরুল ইসলাম। এর মধ্যে প্রথমজন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের দান সম্পর্কে তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য উপস্থাপন ও দ্বিতীয়জন তাঁর মৌলিক কাব্যসৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের শরিকানা নিশ্চিত করেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাঙালি মুসলমানের দান ও অধিকার যে গৌণ বা উপেক্ষা করবার মতো নয়, সত্যি কথা বলতে নজরুলের পরই বাঙালি মুসলমান প্রথম বুক ঠুকে সে কথা বলার সাহস অর্জন করে। এর ফলে দেখা যায়, অন্যদের কথা বাদ দিলেও, বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধিচর্চার পথিকৃৎ হিসেবে যাঁদের নাম স্মরণ করতে হয় তাঁদের প্রায় সবাই (কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল) তাঁদের আদর্শ বা সাহিত্যসৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে ব্যতিক্রমহীনভাবে ও একবাক্যে নজরুলের নামোচ্চারণ করেছেন।

১৯২০ এর দশকের শেষ অবধিও শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সংগীত চর্চা জায়েজ কি না তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত ছিল। আকরম খাঁ প্রমুখকে এ সময় পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে সঙ্গীতচর্চা যে ইসলামে হারাম নয় তা প্রমাণের চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু তাতে যে আশু কোনো ফল দর্শেছে তা নয়। এ পর্যায়ে নজরুল এলেন, এবং আসার সঙ্গে সঙ্গে যাকে বলে জয় করলেন। শ্যামা সঙ্গীত ও কীর্তনের পাশাপাশি তিনি ইসলামি পুরাণ-ইতিহাস, মুসলিম উৎসব-পর্ব, ধর্মীয় পুরুষ ও ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে একের পর এক ‘ইসলামি গান’ — হামদ-নাত, গজল ইত্যাদি লিখে চললেন, তারপর কে মল্লিক-আব্বাসউদদীন প্রমুখ এমন কি ছদ্মনামে অনেক হিন্দু শিল্পীকে দিয়েও তা রেকর্ড করালেন। এভাবে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে তিনি সঙ্গীতের প্রবেশাধিকার ঘটিয়ে দিলেন। তাঁর আগে তো নয়ই, পরেও আর এতটা ব্যাপকতায় ও সফলতার সঙ্গে কে এ কাজটি করতে পেরেছেন? শুধু কি তাই? তাঁর ইসলামি গানের জনপ্রিয়তা এমন যে সে গানের কথায় খোদাপ্রেমকে (নিষিদ্ধ পানীয়) শরাবের সঙ্গে তুলনা করেও তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলেন। এ শিল্পের শক্তি বৈ তো নয় ! নজরুলের এ সাফল্যের দিকটি, তাঁর এ ঐতিহাসিক ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করার সামর্থ্য যদি জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসু দেখাতে না পেরে থাকেন তবে তার জন্য তাঁদেরকে আমরা খুব বেশি দোষ দেব না। তবে প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা থেকে শুরু করে তাঁর রচনাবলির বিরাট অংশ জুড়ে যেভাবে ও যতটা দক্ষতার সঙ্গে তিনি হিন্দু ও মুসলমান বাঙলার এ দুটি প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায়ের পুরাণ ও ঐতিহ্যকে পাশাপাশি ঠাঁই করে দিয়েছেন, যেভাবে সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটিয়েছেন, আমরা যদি সত্যিসত্যি হিন্দু-মুসলমান মিলিত অর্থে বাঙালি জাতীয়তা ও সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী হই, তবে নজরুলকে শুধু বাংলাদেশের নয়, বাঙালির জাতীয় কবির সম্মান আমাদের দিতেই হবে।

তথ্যসূত্র :

আবদুল মান্নান সৈয়দ (সম্পা.), কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, ঢাকা : ২০০১
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী (সম্পা.), জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সংগ্রহ, ঢাকা : ১৯৯৫
বুদ্ধদেব বসু, প্রবন্ধ-সংকলন, কলকাতা : ১৯৬৬

(২০১২)

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ

পরবর্তী খবর

বাঙালি মুসলমানের রবীন্দ্র বিচার

পাকিস্তান সৃষ্টির চার বছরের মাথায় মাহে-নও পত্রিকার আগস্ট ১৯৫১ সংখ্যায় সৈয়দ আলী আহসান ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যের ধারা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাতে তিনি বলেন, “আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রয়োজন আমাদের বেশী।” পাকিস্তানবাদী বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের তরফে সেদিন যে-‘প্রস্তুতি’র কথা বলেছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, দেড় দশকের ব্যবধানে তাই যেন সিদ্ধান্ত রূপে প্রকাশ পায় যখন ১৯৬৭ সালের ২১ জুন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন এক প্রশ্নের জবাবে জানান, ‘ভবিষ্যতে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান প্রচার করা হবে না এবং এ ধরনের অন্যান্য গানের প্রচারও কমিয়ে দেওয়া হবে।” কারণ ততদিনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতির বিপন্নতা তার চরম দশায় পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানি শাসক ও তাদের মতানুসারী বুদ্ধিজীবীরা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের নামে পূর্ব বাঙলার মানুষকে বাঙালি সংস্কৃতির আবহমান ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসটি জোরদার করার তাগিদ অনুভব করেন। ‘রাষ্ট্রীয় সংহতি’র স্বার্থেই সেটা তাঁদের কাছে জরুরি বলে মনে হয়। ইতিপূর্বে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী (১৯৬১) উদযাপন ও অন্যান্য উপলক্ষেও কমবেশি তাঁদের যে-উদ্দেশ্য বা মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধিকার সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা বারবার সে-ঘটনাগুলোর উল্লেখ বা তা স্মরণ করি। কিন্তু রবীন্দ্র-প্রতিভার মূল্যায়নে বাঙলার মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা কি বরাবর একই মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে, এমনকি পাকিস্তান আন্দোলনের তুঙ্গ পর্যায়েও, রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে এমনকি পাকিস্তানবাদী বুদ্ধিজীবীদেরও দৃষ্টিভঙ্গি কি একই রকম নেতিবাচক ছিল? বর্তমান নিবন্ধে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও হবে আমাদের উদ্দেশ্য।

সাধারণভাবে হিন্দু লেখকদের বিরুদ্ধে মুসলমান সমাজ ও জীবনের প্রতি উপেক্ষা বা তার হীন চিত্রায়ন, ইতিহাস বিকৃতি, মুসলমান শাসকদের চরিত্র হনন কিংবা মুসলমান-শাসনের অবমূল্যায়নের অভিযোগ মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীদের তরফে গোড়া থেকেই করা হয়েছে। আর এ ব্যাপারে অভিযোগের প্রধান তীরটা নিক্ষিপ্ত হয়েছে বলা বাহুল্য বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি। তবে এরই পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথেরও ‘শিবাজী উৎসব’, ‘বন্দিবীর’, ‘হোরিখেলা’, ‘ভারততীর্থ’এর মতো রচনার প্রসঙ্গ টেনে তাঁর সম্পর্কেও মুসলমান-বিদ্বেষ প্রচারের অভিযোগ এনেছেন কেউ কেউ। যেমন সৈয়দ এমদাদ আলীর মতো মোটামুটি উদার মতের একজন সম্পাদক-লেখকও বলেছেন, “বাঙ্গালার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথও এ ক্ষেত্রে বাদ পড়েন না।” (‘মাতৃভাষা ও বঙ্গীয় মুসলমান’, নবনূর, ১৯০৩) তাঁর রচনায় বাঙলার বৃহত্তর মুসলমান সমাজের অনুপস্থিতির কথা বলে অভিমান-ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন অনেকে। তবে নোবেল-বিজেতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বখ্যাতি লাভের ফলেই হোক কিংবা অন্য কোনো কারণে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদান থেকে নিজেদের বিযুক্ত করার কথা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট কেউ বলেননি। বরং আমরা দেখি পূর্বোক্ত সৈয়দ এমদাদ আলীই কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর অপর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথের দেওয়া জয়মাল্য শিরে ধারণ করিয়া আমাদের ভাষা-জননী গর্ব্বে স্ফীতা এবং আনন্দে আত্মহারা।” (‘বঙ্গীয় মুসলমান – বঙ্গভাষা ও মুসলমান’, বঙ্গীয়-মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ১৯১৮) মাসিক মোহাম্মদীতকবির-এর মতো পত্রিকায় রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরুদ্ধে ‘পৌত্তলিকতা’ প্রচারের অভিযোগ কিংবা রবীন্দ্র-প্রতিভার অবমূল্যায়ন করে অখ্যাত/স্বল্পখ্যাত কিংবা অদ্যাবধি-অজ্ঞাত ছদ্মনামধারী লেখকদের রচনাকে আমরা এই বিবেচনার বাইরে রাখছি।

২.
কোনো মুসলমান লেখকের তরফে রবীন্দ্র-প্রতিভার মূল্যায়নধর্মী যে-প্রথম মত বা মন্তব্যটির সন্ধান পাওয়া যায় তা আবদুল হামিদ খান ইউসফজয়ীর (১৮৪৫-১৯১০)। তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থ উদাসীর (১৯০০) ভূমিকায় বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্র-প্রতিভার অবস্থান বা বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করতে গিয়ে লেখেন, “জাতীয় সাহিত্য জগতের নন্দনকাননে বাস্তবিক তিনি [রবীন্দ্রনাথ – মোশহা] বাসন্তী পিক! ভাবের বিভোলে বিহ্বল হইয়া যে সকল সঙ্গীত গাথা তিনি দিবানিশি গাহিতেছেন, এবং যে সকল অমৃত লহরী অনবরত ঢালিয়া দিয়া বঙ্গের তাপিত প্রাণ শীতল করিতে প্রয়াসী হইয়াছেন, তাহা হইতে বিদগ্ধ ভারতের ভাগ্যে কালে অমৃত ফল যে না ফলিবেক এমন নহে।” (উদ্ধৃত : আবুল আহসান চৌধুরী, আবদুল হামিদ খান ইউসফজয়ী, ঢাকা : ১৪০৭)

এক্রামদ্দীনের (১৮৮২-১৯৪০) রবীন্দ্র-প্রতিভা বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে, অর্থাৎ, কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পরের বছর। বাঙলা দেশে কোনো মুসলমান লেখকের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা প্রথম বই এটি। সেদিক থেকে এক্রামদ্দীনের ভূমিকা নিঃসন্দেহে পথিকৃতের। বইয়ে লেখক রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন (১৮৯০) নাটকটি নিয়ে দৃশ্যভিত্তিক আলোচনা করেছেন। একটিমাত্র রচনার আলোকে, তা-ও আবার রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভার মূল্যায়নের চেষ্টা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, আর সমকালে কেউ কেউ সে-প্রশ্ন তুলেছেনও। তারপরও, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বইটির আলোচনায় প্রবাসী পত্রিকায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩২২) তখন যেমনটি বলা হয়েছিল, রবীন্দ্র-প্রতিভার ‘নিরপেক্ষ সমালোচনা’র একটি প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এক্রামদ্দীনের মতে রবীন্দ্রনাথ তেমন একজন কবি ‘যাঁর রচনা কাব্যজগতে বিপ্লব আনয়ন করে’। পূর্ববর্তী কবিদের সঙ্গে তাঁর ‘বিস্তর প্রভেদে’র উল্লেখ করে এক্রামউদ্দীন লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের হৃদয় যুক্তিপ্রধান, ভাবপ্রধান নয়’; এবং “রবীন্দ্রনাথের সংযত ভাব ভাষাকে আজ্ঞানুবর্ত্তী মৃদুমন্দ গতিতে পরিচালিত করিয়াছে।” ইতিপূর্বে নবনূর পত্রিকার কার্তিক ১৩১১ সংখ্যায় ‘বঙ্গসাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান’ শিরোনামাঙ্কিত এক রচনায় মোহাম্মদ হেদায়েতউল্লা মুসলমানের গুণকীর্তনে হিন্দু লেখকদের এককালীন অনীহার প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করেন, “সুখের বিষয়, তাঁহারা এখন সে বিষয়েও পরাঙ্মুখ নহেন।” তাঁর এ-উক্তির সমর্থনে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাহিনী (১৩০৬) কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র কাব্যনাট্য ‘সতী’র (১৩০৪) উদহরণ দেন। বলা বাহুল্য এসবই প্রথমদিকের মুসলমান লেখকদের দ্বারা রবীন্দ্র-প্রতিভার ইতিবাচক মূল্যায়নের নজির।

৩.
ঢাকা মুসলিম সাহিত্য-সমাজ বা শিখা-গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত লেখকদের প্রায় সকলেই ছিলেন যাকে বলে রবীন্দ্রভক্ত। গঠিত হওয়ার পর সাহিত্য-সমাজের প্রথম বা উদ্বোধনী অধিবেশনেই (১৯২৬ এর ৩১ জানুয়ারি) ‘রবীন্দ্রকাব্যের স্বরূপ’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন এম. তাহেরউদ্দীন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত অধিবেশনে পঠিত প্রবন্ধটির ওপর আলোচনায় অংশ নেন অন্যান্যের মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির ও এ এফ এম আবদুল হক। কাজী ওদুদ তাঁর আলোচনায় বলেন, “বড় কবিকে বুঝতে হলে বড় চিত্ত চাই।” ১৯২০ এর দশকের গোড়ায় ঢাকায় মনোরঞ্জন চৌধুরী কর্তৃক ‘বিশ্বভারতী সম্মিলনী’ গঠিত হলে, প্রায় গোড়া থেকেই কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল ফজল এই সমিতি ও তার বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর রবীন্দ্র কাব্যপাঠ (১৯২৭) গ্রন্থের খসড়াটি এই সংগঠনের কয়েকটি অধিবেশনেই পাঠ করেন, যা পরে পরিমার্জিত হয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রবাসীর চারটি সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র ১৩৩২) প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ এ-প্রবন্ধের উপসংহারে কাজী আবদুল ওদুদ লেখেন : “রবীন্দ্রনাথ আজ বিশ্ববিখ্যাত পুরুষ। তাঁর খ্যাতিতে বাঙালী গৌরবান্বিত। কিন্তু তাঁর এ খ্যাতিকে সত্যকার খ্যাতিতে রূপান্তরিত করবার, অর্থাৎ, তাঁর প্রতিভাকে একটা জাতির জীবনের বস্তু ক’রে তাকে সার্থকতা দান করবার, শ্রেষ্ঠ অধিকার যে বাঙালীরই আছে এ কথা ভুল্লে চল্বে না। বাঙালীর অত্যন্ত অসম্পূর্ণ জাতীয়জীবন ও সাহিত্যের জন্য এর প্রয়োজন বড় বেশী।” কাজী ওদুদ তাঁর বাকি জীবনে পবিত্র দায়িত্বজ্ঞানে ও গভীর নিষ্ঠায় রবীন্দ্র-প্রতিভার এ পরিচয় তুলে ধরার কাজটি করে গেছেন। রবীন্দ্র কাব্যপাঠ-এর পর প্রকাশিত হয় দুই খণ্ডে তাঁর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ (১ম খণ্ড : ১৯৬২, ২য় খণ্ড : ১৯৬৯)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাড়ির কাছের মুসলমানদের জন্য কী করেছেন’ এ-ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও তাঁর জবাব :

যেহেতু রবীন্দ্রনাথ কবি, এবং যেহেতু মুসলমান মানুষ, সেজন্যে মুসলমান তার আজকার বিশেষ ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রভাবে বুঝুক আর নাই বুঝুক, রবীন্দ্রনাথ বাস্তবিকই তার পরম বন্ধু ব্যতীত আর কিছু নন।

এবং

… মুসলমানীর অর্থ যদি হয় সত্যপ্রীতি, কাণ্ডজ্ঞান-প্রীতি, মানবপ্রীতি, জগৎপ্রীতি, ন্যায়ের সমর্থন ও অন্যায়ের প্রতিরোধ, তবে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় মুসলমান এ যুগে আর কেউ জন্মেছেন কি না সে-কথা এই সব সমালোচকদের গভীর বিচার-বিশ্লেষণের বিষয় হওয়া উচিত।
(‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান-সমাজ’, ১৯৪১)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা সফরে এলে, ১০ ফেব্রুয়ারি, মুসলিম হলে তাঁকে যে-সংবর্ধনাটি দেওয়া হয়, হল-প্রাধ্যক্ষ এ এফ রহমানের কথা বাদ দিলে, তার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল ফজল। সংবর্ধনা সভায় রবীন্দ্রনাথকে প্রদত্ত মানপত্রটি আবুল হুসেনেরই লেখা। উক্ত মানপত্রে যাঁর কাছে ‘হিন্দু নাই, মুসলমান নাই, খ্রিস্টান নাই’ রবীন্দ্রনাথকে তেমন এক ‘বিরাট-প্রাণ মহাপুরুষ’, ‘জাতীয়তার পুরোহিত ও বীর’ হিসেবে সম্বোধন এবং তাঁর সৃষ্টিসম্ভারকে ‘শুধু বাঙ্গালীর নয়, শুধু হিন্দুর নয়, শুধু ভারতবাসীর নয়—বিশ্বমানবের’ বলে উল্লেখ করে বলা হয় :

তুমি আশীর্বাদ কর, যেন তোমার অপূর্ব সৃষ্টির আনন্দ আমাদের উষর-শুষ্ক চিত্তে পৌঁছিতে পারে; চিরন্তন মানবের অধিকারে আমরা তাহাকে গ্রহণ করিতে পারি—আপনার করিতে পারি এবং তাহার দ্বারা আমাদের রস-বিমুখ, শ্রীহীন এই জীবন সরল-সুন্দর করিয়া তুলিতে পারি। … আমরা যেন শাস্ত্র ও কাল, জাতি ও দেশের ক্ষুদ্র সীমার বাহিরে গিয়া মানুষের দানকে নির্বিকারচিত্তে আপনার করিয়া গ্রহণ করিতে প্রবৃত্ত হই। ‘জ্ঞানের রাজ্যে অসহযোগ (Non-co-operation) মৃত্যু’ তোমার এই অমর উপদেশ যেন আমরা কখনও বিস্মৃত না হই।

মানপত্রে আরও বলা হয়, হজরত মুহম্মদের (স.) জীবনের মূলমন্ত্র ‘কর্মের মধ্যে মুক্তি’র বার্তা ‘তামসিক ভারতে’ রবীন্দ্রনাথই নতুন করে ঘোষণা করেছেন। সংবর্ধনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ যা বলেন তাও এ-প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য : “… পাশ্চাত্ত্য দেশে আমি মানবের কবি ব’লে সমাদৃত। তার কারণ কোন সম্প্রদায় বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হ’য়ে আমি কোন কার্য করি নি। … মানুষ সেইখানে শ্রদ্ধেয়, যেখানে মানুষ সকলের হয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছে বিশ্বের মধ্যে, সঙ্কীর্ণতার মধ্যে নয়। … আপনাদের নিকট আমার যে পরিচয় তার কারণ আমি মানুষের সঙ্কীর্ণতার বাহিরে নিজেকে প্রকাশ করতে পেরেছি।”

শিখা গোষ্ঠীর পুরোধাদের মধ্যে যিনি ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ সেই কাজী আনোয়ারুল কাদীর তাঁর ১৯৩০ সালে লেখা প্রবন্ধ ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’য় বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের অভিযোগকে মোটামুটি যথার্থ বলেই মনে করেছেন। তাঁর মতে বাঙলা দেশে সাম্প্রদায়িক বিরোধের জন্য ‘বাংলা সাহিত্যও অনেকখানি দায়ী’। তাঁর একমাত্র প্রবন্ধ-সংকলন আমাদের দুঃখ-এর (১৯৩৪) অপর এক প্রবন্ধ ‘জাতীয় সমস্যা’য় মানুষকে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ পরিচয়ে ভাগ করে দেখা যে ‘রাষ্ট্রিক মহাজাতি’ গঠনের পথে একটি বড় বাধা রবীন্দ্রনাথের এ-মতকে সমর্থন করে তিনি বলেছেন, কবির এই প্রেমের আহ্বান ‘হৃদয়হীন হিন্দু মুসলমানের প্রাণে কোনো সাড়া জাগায় নি’। শিখা গোষ্ঠীর অন্যান্য প্রধান লেখক, যেমন কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও আবুল ফজল ছিলেন আমৃত্যু রবীন্দ্রানুরাগী। এঁদের মধ্যে কাজী ওদুদ ছাড়া বাকি তিনজনই ১৯৪০ এর দশকের শেষ নাগাদ ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। আবুল ফজল তো ১৯৪৫ সালে মাসিক মোহাম্মদীর ‘কায়েদে আজম সংখ্যা’র জন্য একটি নাটকই লেখেন ‘কায়েদে আজম’ নামে, যা পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানোত্তর পর্বে, কিছু কালের জন্য হলেও, কাজী মোতাহার হোসেন তমদ্দুন মজলিশের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু সেদিনকার পরিস্থিতিতে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার অবিকল্প সমাধান হিসেবে পাকিস্তান দাবিটিকে বিবেচনা করলেও, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আর পাঁচটি প্রশ্নে তাঁরা বুদ্ধিমুক্তির চেতনাকেই লালন করেছেন। রবীন্দ্র-মূল্যায়নেও তাঁরা বরাবর উদারনীতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতি-কথা গ্রন্থের ২৯টি প্রবন্ধের মধ্যে ৫টিই রবীন্দ্রবিষয়ক। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথ ‘শুধু কবি নন, মহাপুরুষ’, আর ‘শুধু মহাপুরুষ না বলে’ তাঁকে ‘আধুনিক অথবা বিকাশধর্মী মহাপুরুষ বলা উচিত’। (‘রবীন্দ্রনাথ’) প্রগতিচর্চার নামে রবীন্দ্র-প্রতিভার একমাত্রিক মূল্যায়ন বা বিচারেরও সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন :

পাকিস্তানে কবি ইকবালকে রাষ্ট্রভিত্তি করে তলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। পশ্চিম বাংলায় বা ভারতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুরূপ চেষ্টা চলবে কিনা বলতে পারি নে। …

একব্যঞ্জনীদের পক্ষে বহুব্যঞ্জনী রবীন্দ্রনাথকে বোঝা কঠিন। অথচ তাঁরাই তাঁর জয়ন্তী পরিচালনার ভার নেন। ধার্মিকদের মতো তাঁদের মনও সরলীকরণের দিকে। সত্য তো একরকমের হবে, বিভিন্ন রকমের হবে কেন, এ কথা ভেবে তাঁরা বোকা ব’নে যান। জীবনের বিচিত্র ভোজে যাঁদের নিমন্ত্রণ নেই, তাঁদের যে এ দশা হবে তাতে আর আশ্চর্য কি!

একব্যঞ্জনী প্রাগতিকরা যে কেবল রবীন্দ্রনাথের ওপর জুলুম চালান তা নয়, অপরাপর সাংস্কৃতিক ব্যাপারেও তাঁরা একই মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাঁদের সাম্যনীতির জোয়ারে সব কিছুই একাকার হয়ে যায়।
(‘অহমিকা- সৌন্দর্য-চেতনা – রবীন্দ্রনাথ’)

আবুল ফজলের রবীন্দ্রচর্চার শুরু সম্ভবত ১৯৩৩ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্র-জীবনীর (১ম খণ্ড : ১৯৩৩) একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। যাতে তিনি লেখেন : রবীন্দ্রনাথের জীবনী “কোন একজন ব্যক্তি বিশেষের জীবন-কথা নয়, বরং একটি জাতির যুগ বিশেষের ইতিহাস।” এবং তাঁর “সুদীর্ঘকালব্যাপী জীবনে দেশে এমন কোন অনুষ্ঠান, এমন কোন আন্দোলন আসেনি যার সাথে রবীন্দ্রনাথের মন সাড়া দেয়নি, যা তাঁর প্রতিভার স্পর্শে সমৃদ্ধ হয়নি।” এর তিন দশক পর রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে মুসলমান সমাজের প্রতি বিরূপতা বা উদাসীনতা প্রকাশের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে আবুল ফজল লিখছেন, “কবি হিসেবে তাঁর দিকে না তাকিয়ে, নিজেদের ইচ্ছানুগ কল্পনার সঙ্গে রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য মিশিয়ে মতামত দিতে গিয়েই এ বিভ্রাটের সৃষ্টি।” (‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলিম সমাজ’, ১৯৬৫) আর, তাঁর মতে, “বাংলা ভাষাভাষীদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে না চাওয়া বা সে সম্বন্ধে অনীহা থাকার মতো ক্ষতি কল্পনা করা যায় না।” (প্রাগুক্ত)

সাম্প্রদায়িক বিবেচনা প্রসূত রবীন্দ্র-বিরোধিতার অংশ হিসেবে নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাবার একটা অপচেষ্টা পাকিস্তানোত্তরকালে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। এর মোকাবেলায় কাজী মোতাহার হোসেন লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ছিল না, ছিল গুরু-শিষ্যের মত। … দেশের সবাই যখন তাঁকে [নজরুলকে — মোশহা] পরিহাস করছিলেন রবীন্দ্রনাথই তাঁকে যথার্থ বুঝতে পেরেছিলেন।” (‘আমার বন্ধু নজরুল : তাঁর গান’) জানিয়েছেন, “প্রথম যৌবনে নজরুল রবীন্দ্রনাথের গানকে সবকিছুর উপর স্থান দিয়েছিলেন।” (প্রাগুক্ত) অবশ্য এরই পাশাপাশি রবীন্দ্র জন্ম-শতবর্ষে লেখা অপর এক প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে এক শ্রেণীর রবীন্দ্রানুসারীর বাড়াবাড়ি বা শুচিবায়ুগ্রস্ততারও সমালোচনা করেন। (‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’)

৪.
ঘোরতররূপে পাকিস্তানবাদী এবং পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তারূপে যে-সব কবি-লেখকের আবির্ভাব তাঁদেরও কেউ কেউ প্রাক-পাকিস্তান পর্বে তাঁদের রবীন্দ্র-অনুরাগ প্রকাশ এবং রবীন্দ্র-প্রতিভার ইতিবাচক মূল্যায়নে অকুণ্ঠচিত্ততার পরিচয় দিয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে আমরা এখানে দুজনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে পারি : গোলাম মোস্তফা ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন। কি পাকিস্তান-পূর্ব কি পাকিস্তানোত্তর পর্বে নজরুল প্রসঙ্গে ‘পৌত্তলিক ভাবধারা ও প্রকাশভঙ্গি’ অনুসরণ এবং ‘হিন্দু ও হিন্দুয়ানি-প্রীতি’র অভিযোগ পুনঃপুনঃ ও জোরালোভাবে করলেও, গোলাম মোস্তফা এমনকি তাঁর ১৯৪০ এর দশকে প্রকাশিত প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথ ও অতীয়ন্দ্রবাদ’-এও (১৯৪৩) রবীন্দ্রকাব্য পাঠের উপকারিতার কথা বলেছেন। ইতিপূর্বে বঙ্গীয়-মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৯ সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি রবীন্দ্র কবিতার ভাব ও আদর্শের সঙ্গে ইসলামের ‘চমৎকার সৌসাদৃশ্য’এর উল্লেখ করে লেখেন, “তাঁহার [রবীন্দ্রনাথের — মোশহা] ভাব ও ধারণাকে যে-কোন মুসলমান অনায়াসে গ্রহণ করিতে পারে। বাংলা ভাষায় আর কোন কবি এমন করিয়া মুসলমানের প্রাণের কথা বলিতে পারেন নাই।” উক্ত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মুসলমানদের ‘গর্ব করবার যথেষ্ট কারণ আছে’ বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে যেভাবে দেখেছেন তা ‘ইসলামের সম্পূর্ণ অনুমোদিত’; এবং ‘পৌত্তলিকতা, বহুত্ববাদ, নিরীশ্বররবাদ, জন্মান্তরবাদ, সন্ন্যাসবাদ প্রভৃতি’ ইসলাম বিরোধী ধারণা ‘রবীন্দ্রনাথের লেখায় অনুপস্থিত বললেও অত্যুক্তি হয় না’। অথচ একই গোলাম মোস্তফা তাঁর পাকিস্তানোত্তরকালে রচিত প্রবন্ধ ‘ইকবাল ও রবীন্দ্রনাথ’-এ (১৯৬০) সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য উপস্থাপন করেন। রবীন্দ্র-কাব্যের প্রেরণা ও দর্শনকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “যে-কারণে ইকবাল প্লেটো বা হাফিজকে আমল দেননি, ঠিক সেই কারণে আমরা রবীন্দ্রকাব্যকেও আমল দিতে পারি না।”

আবুল কালাম শামসুদ্দীন ১৯২০ এর দশকে লেখা তাঁর ‘কাব্য-সাহিত্যে বাঙালী-মুসলমান’ প্রবন্ধে (সওগাত, ১৩৩৩-৩৪) লিখেছিলেন, “কবির সৃষ্টি সুন্দর হইল কিনা, তাহাতে বিশ্বমানবের কোন মঙ্গল নিহিত আছে কিনা এবং কোন সত্যের দিকে উহা অঙ্গুলি নির্দেশ করিতেছে কিনা, ইহাই হইল কাব্য যাচাই করিবার মাপকাঠি। সুতরাং কাব্যে অনৈসলামিকতার দোষারোপ আমরা ঠিক বুঝিতে পারি না।” যাঁরা সে রকম দোষারোপ করেন, তাঁদের সে ‘উদ্ভট প্রয়াসে’র সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, “পারস্য-সাহিত্যে হাফেজ-ওমর খৈয়াম প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ কবিগণের কাব্যে ইসলামী অনুশাসনের খেলাপ কথা আছে বলিয়া কোন সমালোচক তাঁহাদিগকে কবি হিসাবে শ্রদ্ধা অর্পণ করিতে ত্রুটী করেন নাই। কেবল বাঙ্গলা দেশেই কাব্য সম্বন্ধে এই সার্বজনীন মতের ব্যতিক্রম দেখা যায়।” কাব্যে বা সাহিত্যে যাঁরা ইসলামি অনুশাসনের গুণ-গরিমার ব্যাখ্যান কিংবা ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ খোঁজেন, তাঁদেরকে তিনি বরং ‘কাব্য না পড়ে ইতিহাস পড়তে’ উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আবুল কালাম শামসুদ্দীনকেই আমরা দেখি ১৯৬৭ সালের রবীন্দ্রসংগীত বিতর্ককালে পাকিস্তানের তামুদ্দুনিক স্বাতন্ত্র্যের যুক্তিতে তথ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতিদাতাদের অন্যতম হিসেবে।

এমনকি, তাঁদের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদী অবস্থান সত্ত্বেও, রবীন্দ্রজন্ম শতবর্ষ (১৯৬১) উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র প্রশস্তিমূলক বক্তব্য রেখেছেন, রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া বাংলা সাহিত্য ‘অর্থহীন’ এমন অভিমত প্রকাশ করেছেন, সে-রকম অন্তত দুজন বুদ্ধিজীবী সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ও হাসান জামানকে কয়েক বছরের ব্যবধানে রবীন্দ্রসংগীত বিতর্ককালে ভিন্ন অবস্থানে দেখা যায়। এর তাৎপর্য বুঝতে আমাদের অসুবিধা হবে না যদি আমরা আরও পরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায়ও তাঁদের ভূমিকাটিকে স্মরণে বা বিবেচনায় রাখি।


অবশ্য আমাদের মনে রাখা উচিত, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের এই ইতিবাচক-নেতিবাচক মূল্যায়ন-সমালোচনার সমসময়ে তাঁর আপন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকেও তিনি কম নিন্দা-বিদূষণের শিকার হননি। যার উল্লেখ করে সত্তরতম জন্মজয়ন্তীতে তাঁর অভিমানক্ষুব্ধ উচ্চারণ : “এমন অনবরত, এমন অকরুণ, এমন অপ্রতিহত অসম্মাননা আমার মতো আর কোনো সাহিত্যিককেই সইতে হয়নি।” (‘আত্মপরিচয়’) তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগেই অক্ষয়চন্দ্র সরকার, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখের হাত দিয়ে যার শুরু, তাঁর মৃত্যুর সত্তর বছর পর আজও রবীন্দ্র-বিরোধিতার সে ধারা কমবেশি অব্যাহত আছে। আর বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাস, সজনীকান্ত দাস, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, রমাপ্রসাদ চন্দ, শিবরাম চক্রবর্তী, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, ভবানী সেন (রবীন্দ্র গুপ্ত), বিনয় ঘোষ, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শিবনারায়ণ রায়ের মতো তাবড় তাবড় মানুষ আগেপরে ‘রবীন্দ্র-বিদূষণে’র এই মিছিলে শরিক হয়েছেন (এঁদের কেউ কেউ অবশ্য পরে তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন, বক্তব্য প্রত্যাহার করেন)। সাহিত্য, নারায়ণ, কল্লোল, শনিবারের চিঠি, প্রগতি, পরিচয়, নতুন সাহিত্য, মার্কসবাদী প্রভৃতি পত্রিকাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা এই রবীন্দ্র-বিতর্কে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে কখনো ‘অস্পষ্টতা’, ‘দুর্বোধ্যতা’ বা ‘হেঁয়ালিপনা’র, কখনো ‘অশ্লীলতা’ বা ‘দুর্নীতি’র, আবার কখনো প্রতিক্রিয়াশীলতা বা প্রতিবিপ্লবীয়ানার — গণবিরোধিতা, সামন্ত-স্বার্থের পোষকতা, ঔপনিবেশিক প্রভুদের তোষণ ইত্যাদি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র সংগ্রামপন্থী রণদিভে-লাইন এবং এ-সময় চলমান বামপন্থী প্রগতি সাহিত্য-আলোচনার প্রভাবে ১৯৪০-৫০ দশকে রবীন্দ্র-বিরোধিতার ঢেউ পূর্ব বাঙলার প্রগতিবাদী লেখক-সংস্কৃতি কর্মীদেরও আক্রান্ত করে। মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, আখলাকুর রহমান ও আবদুল্লাহ আল মুতীর মতো প্রগতি-কর্মীরা যার শিকার হন (এঁদের সঙ্গে একমত হতে না পারায় ঢাকা প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সভাপতি অজিত গুহকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়)। বিভাগোত্তর পূর্ব বাঙলায় বামপন্থীদের এই রবীন্দ্র-বিরোধিতা অবশ্য খুবই স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। কারণ অচিরেই তাঁদেরকে এক প্রবল প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করতে হয়, ধর্ম-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে যারা শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, সামগ্রিকভাবে বাঙালি সংস্কৃতি এমনকি বাংলা ভাষাকেও তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।


পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্বাভাবিকত্ব সম্পর্কে ধারণা বা এক রকম সচেতনতা এবং এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ বা আশঙ্কা থেকেই খুব সম্ভব পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিত্ত্বের (‘ভারতবর্ষে দুটি জাতি হিন্দু ও মুসলমান’ : যা আসলে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদে’র এন্টিথিসিস) ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই দেশের মানুষকে প্রথমে তাদের হিন্দু-মুসলমান পরিচয় ভুলে এক ‘পাকিস্তানি’ জাতীয়তার ছাদনাতলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান (১৯৪৮ সালের ১১ আগস্ট গণপরিষদে ভাষণ)। পরবর্তীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মুখে তিনিই আবার বলেন, “আমরা যদি নিজেদেরকে প্রথমে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি ইত্যাদি মনে করে শুধু প্রসঙ্গক্রমে নিজেদেরকে পাকিস্তানি ভাবতে শুরু করি, তাহলে পাকিস্তান ভেঙে যেতে বাধ্য।” (১৯৪৮ সালের ২৮ মার্চ প্রদত্ত বেতার- বক্তৃতা) জিন্নাহর উত্তরসূরিরাও পরবর্তীকালে সেই একই আশঙ্কা বা মনোভাবের দ্বারা চালিত হয়ে প্রায় একই বক্তব্য ও আচরণের পুনরাবৃত্তি করে গেছেন। দেশের সংখ্যগরিষ্ঠ মানুষের বাস যেখানে সেই পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের জনগণকে তাদের বাঙালি পরিচয়টি যথাসম্ভব ভুলিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের ভাঙন রোধ করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। আর পূর্ব বাঙলার মানুষকে আবহমান বাঙলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষ করে রবীন্দ্র-সাহিত্যের সমৃদ্ধ ও সুমহান উত্তরাধিকার থেকে বিযুক্ত করার প্রয়াস ছিল তাদের সে অভিপ্রায়েরই অংশ। আমাদের স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের দু-চারজন হয়তো স্বার্থবুদ্ধির বশে তবে বেশিরভাগই নিজস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানি শাসকদের সে-অভিসন্ধি বাস্তবায়নে তাদের সঙ্গে শরিক হয়েছিলেন। দীর্ঘ একনায়কত্ববাদী ও সামরিক শাসন, ক্রমবর্ধমান শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অবদমনের মুখে একদিকে যেমন বাঙালির প্রতিরোধ চেতনা জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার রূপ নিয়ে শত শিখায় জ্বলে উঠতে থাকে, তেমনি পাকিস্তানবাদী বুদ্ধিজীবীরাও এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যচেতনাকে জোরদার করার মাধ্যমেই তাঁরা এই ‘দুরবস্থা’ থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজেন। যা কার্যত ভুল প্রমাণিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায় এদেশের মানুষ আরও বেশি করে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে। রবীন্দ্রনাথের গান কণ্ঠে নিয়ে তাঁরা যুদ্ধ করেছে। সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত দেশে রবীন্দ্রনাথের একটি গানকেই তারা জাতীয় সংগীত হিসেবেও বেছে নিয়েছে।

(২০১১)

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ

বিষয়:
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত