
ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জৌলুশ এখন অনেকটাই ফিকে। একসময়ের প্রাণবন্ত এই প্ল্যাটফর্মগুলো আজ যেন শুধুই অ্যালগরিদম, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট আর বটের দখলে। ব্যবহারকারীরাও আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যক্তিগত জীবনের গল্প শেয়ার না করে এখন নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে স্ক্রল করে চলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই সোনালি যুগ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে, তবে এর মৃত্যু ঘটেনি—বরং এক বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম।
সোনালি যুগ থেকে আজকের বাস্তবতা
দুই দশক আগে ফ্রেন্ডস্টার, মাইস্পেস কিংবা পরবর্তী সময়ে ফেসবুক ও টুইটারের উত্থানের সময়টাতে ডিজিটাল যোগাযোগের পরিবেশ ছিল অন্যরকম। তখন এটি ছিল বন্ধু বা প্রিয়জনদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক জীবন্ত মাধ্যম। বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্য বা রাজনৈতিক মেরুকরণ না থাকায় ব্যবহারকারীরা একে নিরাপদ মনে করতেন। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক এবং অ্যালগরিদমের আধিপত্য সব বদলে দিতে শুরু করে। ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে প্ল্যাটফর্মগুলো এমন সব উসকানিমূলক কনটেন্ট সামনে আনতে থাকে, যা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিজেদের মতামত প্রকাশ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সমস্যার মূলে অ্যালগরিদম ও মানুষের মনস্তত্ত্ব
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, এই সংকট কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে এমন এক প্রতিযোগিতামূলক বা বৈশ্বিক বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে মতের ভিন্নতা মানেই শত্রুতা। আগে মানুষ স্থানীয় পরিমণ্ডলে ভিন্নমতের মানুষকে মেনে নিয়েও মিলেমিশে থাকত, কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সেই সহনশীলতাকে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবর্তনের এই ধারায় মূলত তিনটি বড় ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে :
১. ব্যক্তিগত পরিসরে স্থানান্তর : মানুষ এখন পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ডিসকর্ড বা ব্যক্তিগত গ্রুপ চ্যাটে বেশি সক্রিয় হচ্ছে। এছাড়া সাবস্ট্যাকের মতো প্ল্যাটফর্মে বিশ্বস্ত লেখকদের কনটেন্ট পড়ার দিকেও আগ্রহ বাড়ছে।
২. শর্ট-ভিডিওর রাজত্ব : টিকটক বা রিলসের মতো ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেকটা পকেট টেলিভিশনের রূপ নিয়েছে।
৩. এআই-এর উত্থান : জেনারেটিভ এআই-এর উন্নতির ফলে মানুষ এখন অন্য ব্যবহারকারীর চেয়ে চ্যাটবটের সঙ্গেই বেশি আলাপচারিতা করছে।
তবে এই পরিবর্তন আমাদের ডিজিটাল জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ব্যক্তিগত গ্রুপে আশ্রয় নেওয়া মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়; এগুলো ভবিষ্যতে নতুন ধরণের ‘ইকো চেম্বার’ বা মতাদর্শের কারখানা হয়ে উঠতে পারে। আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সচেতনতা ছাড়া এই পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।