
জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। চলমান তীব্র মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং রিজার্ভের চাপের মধ্যে এবারের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি ফেরাতে পারবে, তা নির্ভর করছে এর শতভাগ স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। কেবল বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বা গতানুগতিক বরাদ্দের মধ্যেই বাজেটের সার্থকতা সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন তলানিতে, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বাজেটের কোনো সুফলই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে না। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে কেবল সাময়িক অভিযান নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা না চাপিয়ে, যারা এতদিন করের আওতার বাইরে ছিল বা কর ফাঁকি দিচ্ছিল, তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের কৌশল বের করতে হবে।
এই সংকটময় মুহূর্তে বাজেটের সফল বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও সরকারি কেনাকাটায় দীর্ঘদিনের যে অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তা রুখতে এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপর জোর দিতে হবে, যেন অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা রাষ্ট্রের ঘাড়ে না চাপে। পাশাপাশি, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এবং অর্থপাচার রোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিশেষে, একটি বাজেট কতটা জনবান্ধব, তা শুধু এর আকার বা হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক তার ওপর। নতুন এই অর্থবছরে নীতিনির্ধারকদের উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন, দুর্নীতি রোধ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল কাগুজে পরিকল্পনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে এর নির্মোহ ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।